ঢাকা থেকে সিলেট
তারিখঃ ২৫/০১/২০১১
সব বর্ণনার গৌড়চন্দ্রিকার প্রয়োজন পরে না। যারা আমার সহমর্মী-সহকর্মী ও যারা নন, তারা ছাড়া সকলের জন্য আমার এই পূর্বকথন। এটি কোন ভ্রমন কাহিনী হয়ে উঠতে পারতো যদি আমি লেখক হতাম (লেখাটি ভ্রমন কাহিনী হয়ে গেলে আমার লেখক হবার সম্ভাবনা আছে)।
“সাধারনত মানুষ বাহন ব্যবহার করে এক যায়গা থেকে অন্য যায়গায় যাবার জন্য। কখনো কখনো বাহন মানুষ ব্যবহার করে একই কাজে।“
গতকাল সমস্ত অফিসিয়াল কাজ শেষ করে রাখা হয়েছে, সুতরাং আজকে সকাল সকাল রওনা হওয়া যাবে। নাস্তার সময় নেই। তাড়াতাড়ি শিক্ষাভবনে পৌছাতে হবে। ধামরাই থেকে প্রায় আড়াই ঘন্টা লাগবে। আটটার বাস ধরতে পারলে এগারটার মধ্যে সিলেটের পথে রওনা হতে পারবো। ড্রাইভার রেজাউল গত রাত্রে ঢাকা এসেছে শিক্ষাভবন থেকে একটি গাড়ি চালিয়ে সিলেট নিয়ে যাবার জন্য। গাড়িটি অনেক ঝামেলা করে সংগ্রহ করা হয়েছে। এস ই ডি পি প্রকল্পের গাড়ি ডি আই এ এর কাছে ছিল, টিকিউআই-সেপ এর অর্থায়নে সিলেটে জাফর ইকবাল স্যারের একটি প্রকল্পে গাড়িটি ব্যবহারের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করে। দীর্ঘ ছয় মাস নানা প্রতিকুলতার মোকাবেলা করে টিকিউআই-সেপ এর প্রকল্প পরিচালক শেষ পর্যন্ত গাড়িটির ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। আমার দায়িত্ব মাইক্রোবাসটি সিলেট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। গতকালই গাড়িটি বুঝে নিয়েছি।
মাইক্রোবাস
মডেল এল-৩০০ নং ঢাকা মেট্রো চ-৫১-৪৬১৮
বডিঃ বহু ব্যবহারের চিহ্ন বহন করছে
চাকাঃ টায়ার একেবারে মসৃন
ফুয়েলঃ গ্যাস ও পেট্রল
গ্যাস সিলিন্ডারঃ ৬২.৫ কেজি (গ্যাস কিট সম্ভবত ত্রুটিযুক্ত)
কাগজপত্র ও অন্যান্য
রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স টোকেন (কর পরিশোধ), ফিটনেস সনদ, চাবি (একটি), জ্যাক
সকাল ৭ টা ৩০
মাঘ মাসের সকাল। বড় কষ্ট হল বিছানা ছাড়তে। এখনি রওনা না হলে সন্ধ্যার আগে সিলেট পৌছানো যাবে না। নাস্তা পথে কোথাও করে নেব।
সকাল ১০ টা ৩০
শিক্ষাভবনের নীচ তলায় মাইক্রোবাসটি রাখা আছে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। ড্রাইভার রেজাউল এখনো পৌছেনি। চাবি আমার কাছেই। একটু গাঁইগুঁই করে শেষ পর্যন্ত গাড়ি স্টার্ট নিল। রেজাউল এসে পরায় গাড়ির পিছনের বসে যাওয়া চাকা বদলাতে বলে ডিপিডি স্যারের সাথে দেখা করে এলাম। গাড়ি আর স্টার্ট হয় না। খুসখুসে কাশির রূগীর মত কাশতে থাকে। সিদ্ধান্ত হল ঠেলে চালু করা হবে।
সকাল ১১ টা ৩০
মেকার এসেছে। লিক হওয়া চাকা বদলাতে গিয়ে রেজাউল নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মেকার যখন ঘোষনা দিল সেলফ এ সমস্যা ঠিক তখনি মাইক্রোবাসটি চালু হল। মেকার চারশ টাকা নিয়ে বিদায় হল। এর পর স্টেডিয়ামের পাশ ঘুরে সায়দাবাদ হয়ে সিলেট। .........।
সকাল ১১ টা ৪৫
অভিসার সিনেমা হল পাশে এটিএম (ব্র্যাক ব্যাংক)। যেই থেমেছি ওমনি বিগড়ে গেল গাড়ি। রেজাউল তিন লিটার পেট্রল (তেল) নিয়ে এল। এরপর প্রায় পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা (এখন থেকে গাড়িটিকে ব্যক্তি হিসাবে দেখতে হবে মনে হচ্ছে) আর আমি হলাম গাধা। আক্ষরিক অর্থেই ঠেলতে হল। একজন ফিফথ গ্রেড অফিসার হয়ে আমাকেই কিনা......।
দুপুর ১২ টা ৩০
এর মধ্যে তিনবার নামতে হয়েছে গাড়ি থেকে। কেনো? রাধাকে সাধা। তবে আমরা এখনো সায়দাবাদ এর মোড় পার হইনি, তবে ইঞ্জিন এখন চালুই আছে। জ্যামের মধ্যে বন্ধ হলে মান ইজ্জত বিসর্জন হয়ে যাবে বিনা দশমীতে। যাক রেল ক্রসিং পার হয়েছি।
দুপুর ১২ টা ৩০
জনপথ মোড়ের আগে বিগড়ে গেলেন রাধা। চারজন উটকো লোক একশ টাকার বিনিময়ে অবাধ্য রাধাকে ঠেলে বাহন স্রোতে তুলে দিল। বোধ করি ঢাকার দূষিত বাতাসেই যক্ষা আক্রান্ত হলেন বিনোদিনী। দুটি কাশি, একটি হাসি আর আমার ফাঁসি একসঙ্গে ঘটলো। ঠিক একটি চৌরাস্তায়। ঘটনার কেন্দ্রে থাকার খায়েস ছিল তাই বলে এভাবে জ্যামের কারণ হিসাবে নয়। এবার এই ফিফথ গ্রেড অফিসারের সাথে কাধ মেলালেন ট্রাফিক পুলিশ (এদের সম্পর্কে অনেকেই (আমি সহ) নিন্দাবাক্য বলে)।
দুপুর ০১ টা ৩০
আমাদের বর্তমান অবস্থান চৌরাস্তার কেন্দ্র হতে বিশ গজ সামনে রাস্তার ডান দিক ঘেঁষে। একজন প্রবীন মানুষ আমার দিকে আধা-করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন। ইনি যাত্রাবাড়ি ফ্লাই ওভার নির্মান কোম্পানীর কর্মচারী। পাঁশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জাতের গাড়ির স্রোত ধীরে ধীরে। প্রায় একঘন্টা ধরে বসে আছি। ছুঁচোর কেত্তন চলছে পেটে যদিও আধ সের পরিমান ধুলা গেলা হয়ে গেছে। রেজাউল গেছে লেবার অথবা মেকার খুজতে। শেষ ধাক্কা দেয়ার সময় শরীর জানান দিয়েছে বয়স হয়েছে। মনে সাহস আনছি এই ভেবে চল্লিশ এমন কোন বয়স নয়। এই বয়সে সত্যজিত রায় ফেলুদা লিখতে শুরু করে সফল হয়েছেন।
বিকাল (প্রায়) ০3 টা ৩০
মেকার এসেছে। লেবারও এসেছে। পাঁচজন লোক মিলে কোন রকমে বামের রাস্তায় নিয়ে আসা হয়েছে। রাস্তাটি একদিকে ঢালু। লেবার তিন জন একশ বিশ টাকা হজম করে আমাকে আর্থিক ভাবে হাল্কা হতে সাহায্য করল। এবার মেকার ড্রাইভ করতে শুরু করলে আমার মনে রেজাউলের দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ ও হতাশা জেগে উঠল। এখন বেশ চলছে গাড়ি। সবিনয় অনুরোধে মেকার ভদ্রলোক গলি পথে আমাদের ডেমরা রোড পর্যন্ত ড্রাইভ করে পৌছে দিল। জানিয়ে দিল সেলফ কাজ করছে না (ঠিক করতে কমপক্ষে তিন ঘন্টা)। সুতরাং ইঞ্জিন বন্ধ হলে ধাক্কা ছাড়া স্টার্ট হবে না। এবং গ্যাস ছাড়া ধাক্কা দিয়েও ইঞ্জিন চালু হবে না এমনভাবেই গ্যাসের লাইন করা আছে। একশ টাকা বকশিশ কম হয়ে গেল কি না কে জানে, বিশেষ করে সে যখন তার প্লায়ার্স গাড়িতে ফেলে গেল।
বিকাল (নিশ্চিত) ০৫ টা ১৫
ঢাকা শহর ফেলে সিলেটের পথে বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হিসাব করতে শুরু করা গেল। গ্যাস নিতে হবে প্রথম সুযোগেই। গ্যাস মিটারে তিন বাতি জ্বলছে। কোন গ্যাস স্টেশন গ্যাস দিলনা। পাঁচটার পর বন্ধ। আবার রাত নয়টার পর খুলবে। সারে চার ঘন্টার অপেক্ষা। সিদ্ধান্ত হল মাধবদী গিয়ে সেলফ ঠিক করে নিয়ে তারপর গ্যাস নিয়ে যাত্রা শুরু করব। বহু পরিশ্রমে সেলফটি গাড়ির তলা থেকে খুলে আনা হলে দেখা গেল সেটি পুড়ে গেছে। ঠিক করতে দুই হাজার টাকা এবং তিন ঘন্টা সময় লাগবে। প্রস্তাব নাকচ করা হল। ধাক্কা পদ্ধতি ব্যবহার করেই সিলেট যাব। ব্যাটারী শর্ট হয়ে যেতে পারে সন্দেহে সেটি খুলেই রাখা হল। পেটের ছুঁচো গুলি ক্লান্ত হয়ে কেত্তনে ক্ষ্যান্ত দিয়েছে।
রাত ৮ টা ৪৫
ইসলাম সি এন জি ফিলিং ষ্টেশন, মাধবদী এর পাশে একটি দোকানে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্যান্ডউইচ খাচ্ছি। শরীরের সমস্ত পেশী বিদ্রোহ করেছে। ধাক্কা পদ্ধতি কতটা নির্মম হতে পারে তার একটি নমুনা অভিজ্ঞতা হয়েছে গত এক ঘন্টায়। সাত দফা ধাক্কা স্টার্ট (আমি একা) বিফল হলে অনেক খুজে তিনজন লোক ভাড়া করা হল। আরো দেড়শ গেল। আরো পনের মিনিট পর গ্যাস দেবে।
রাত ১১ টা ০০
মাধব পুর ছাড়িয়ে শায়েস্তাগঞ্জ এর পথে হাইওয়ে ইন; ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রচেস্টা। পথে পচাত্ত্র কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে গ্যাস নেয়া হয়েছে তারপর ত্রিশ কিলোমিটার চলে আরো একবার। আরো একশ ছাব্বিশ কিলোমিটার পথ। ছোট্ট একটি দুঃসংবাদ হল সিলেটের আগে আর কোন গ্যাস স্টেশন নাই। হিসাব বলে সিলেট এর দশ কিলোমিটার এর মধ্যে পৌছে যাব। দেখা যাক।
রাত ২ টা ১০
সিলেট পৌছে গেছি। শেষ বিশ কিলোমিটার রূদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। টপ গিয়ারে গাড়ি সত্তুর কিলোমিটারের বেশী বেগ তোলা যাচ্ছে না কারন কুয়াশা ছাড়াও গাড়িভ চাকা যাকিনা একেবারেই মসৃন। রেজাউল প্রতিটি মাইল স্টোন গুনে আর কত পথ বাকি তার হিসাব দিচ্ছে ধারাবিবরণী স্টাইলে। এ যেন শেষ ওভারে শেষ ব্যাটস ম্যানের পাচ বলে দশ রান তোলার টার্গেট। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে তুলে নেয়া একজন গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী এই ঘটনার অংশীদার। উনি প্রয়োজনে গাড়ি ধাক্কা দিতে হবে এই শর্তে আমাদের সঙ্গী হয়েছিলেন।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)