শুক্রবার, ৬ এপ্রিল, ২০১২

তুখোড় শিক্ষক

সাকিব
কেমন আছ। দেখলাম তুমি আমার আগের পোষ্ট পড় নি। আমার ব্লগটি এবার শুধু গরিব নয় একেবারে ভিখিরি হয়ে গেল। যা হোক এবার আমি লিখছি কিছু ধারণার বিষয় নিয়ে। জানোইতো নতুন নতুন ভাবনা আমার মাথায় কিলবিল করতে থাকে যতক্ষন না সেগুলির বাস্তব প্রয়োগ সংক্রান্ত বাস্তবতা সজোরে চড় মেরে আমাকে মাটিতে নামিয়ে আনে। যে ধারণাটি আমাকে জ্বালিয়ে যাচ্ছে তা হল শিক্ষকদের কিছুটা জনপ্রিয়তার স্বাদ দিকে পারলে কি হয় তা দেখা।

জ্বি হ্যাঁ আমি শিক্ষকদের স্টার বানাতে চাই। তাদের নিয়ে আসতে চাই পাবলিক খেতাবের তালিকায়। এই পোড়া দেশে সবাই কিছু না কিছু পায় মিডিয়ার কল্যানে, শুধু স্কুলের মাস্টাররা বাদে। গানে সুপারস্টার, নাচে, অভিনয়ে সব খানেই প্রচারের একটা প্রভাব পড়েছে আজকাল। মায়েরা বাবারা বাচ্চাদের ছবি আঁকার ক্লাসে পর্যন্ত প্রতি সুক্কুরবার নিজের ব্যক্তিগত আয়েষ সারেন্ডার করে নিয়ে যাচ্ছেন। মিডিয়া আজকাল অনেক অসাধ্য সাধন করছে। শিক্ষকতা পেশাকে পপুলার করার কাজটি তারা যদি করে তাতে কোন দোষের কাজ হবে কিনা আমার জানা নেই। তবে শিক্ষকেরা যদি তাদের জন্য বরাদ্দ কাজটি করার জন্য বাড়তি কোন প্রচার পায়, অর্থ পায় তাতে ভাল হবে বলেই আমার মনে হয়।

আমার বিশ্বাস শিক্ষকতা এমন একটি শিল্প যা চর্চা করা হয় অত্যন্ত অগোছালো আর অপরিকল্পত ভাবে- অন্তত আমার এই হতভাগা দেশে। অথচ সঠিক পথে চর্চা করা হলে এটিও হয়ে উঠতে পারে একটি সুষম সংগীত। দেশের বাইরের ধণী আর উন্নত দেশগুলির কথা আমি জানি না। হয়তো সেখানে অবস্থা ভিন্ন।

আমি কজটি করতে চাই। অন্তত চেষ্টা করতে চাই যতক্ষন পর্যন্ত না বাস্তবতার চড়টি গালে এসে পড়ে। আমার জন্য আমিই নিজেকে বলছি- Best of luck.

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০১২

বেগুণী শাড়ী

সাকিব
এ লেখাটি তোমার জন্য। এই দরিদ্র ব্লগের এখন পর্যন্ত তুমিই একমাত্র পাঠক। ভবিষ্যতে পাঠক সংখ্যা বাড়বে এমন প্রত্যাশা না করেই আজকের লেখাটি লিখতে বসলাম।


২৫ বছর আগের কোন একটি দিনে নটরডেম কলেজের তিন ছাত্র (দুই জনের স্বাস্থ্যের যোগ ফল তৃতীয় জনের সমান) হঠাৎ করেই বেড়িয়ে পরে গ্রাম দেখতে। মানস, রুমী (সাকিব আহসান) আর লিপন (মাহবুবুর রহমান) ত্রিমূর্তী ঢাকার কাছেই আশুলিয়া এলাকার জিরাবো হয়ে ইয়ারপুর গ্রাম দেখার প্রত্যাশায় বাসে চড়ে বসে। এলাকাটি উঁচু বলে স্থানীয় লোকের কাছে এর নাম ট্যাংগোর। 

দলটির নেতা মানস (?! ওর পিসির বাড়ি ওই এলাকায়)। বাস থেকে নেমে বাঁশবন ছাঁওয়া ঘন আম-কাঠালের বাগানের মধ্য দিয়ে পায়ে হেটে ৩ কিলোমিটার মত। সময়টা বর্ষার কাছাকাছি কোথাও। আকাশ তখন পরিস্কার বলে দিনটি ঝকঝক করছিল। শহুরে লোকের হিসাব মতে সকালের নাস্তা খাবার সময়টায় ত্রিমূর্তী নানা জাতের পাখ-পাখালী সৃষ্ট কলতানের নদী সাঁতরে চলছিলো অজানা গন্তব্যর দিকে। পিসির বাড়ির রাস্তা কিছুটা জানা আর বেশীর ভাগই আন্দাজের উপর এই মানসিক অবস্থায় নেতাটি বার তিনেক পথ হারিয়ে একঘন্টার রাস্তা প্রায় আড়াই ঘন্টায় পাড়ি দিলো (যদিও সে সর্বদাই দাবি করে আসছিলো যে সে সঠিক রাস্তাটিই ব্যবহার করছে)। সংগীদের মধ্য দ্বিগুন স্বাস্থ্যের সদস্য খানিকটা গাঁই-গুঁই করে পথ চলছিল। সংগীটিকে চিনতে পারছো নিশ্চয়ই।


বেগুনী শাড়ী পড়া পিসির বাড়ি পৌঁছে আদি গ্রাম্য আতিথেয়তার কথা তোমার মনে আছে? কাঠাল-মুড়ির নাস্তা তারপর ভয়ংকর ঝাল দিয়ে রান্না করা মুরগী মনে পড়ে? ভাত খেতে বসে চোখের জল নাকের জলে একাকার। আমি তো পরবর্তী এক সপ্তাহ সোজা হয়ে বসতে পারি নি। মনে পড়ে?


বাড়ি থেকে বের হয়ে হাতের ডানে নতুন কিশোরীর মসৃন কোমড়ের বাঁকের মত  রাস্তা ধরে আম-কাঁঠালের বাগ, তাল গাছ আর বৃষ্টি ভেঁজা রাস্তায় টলোমলো পায়ে চলতে চলতে প্রান খোলা হাসির লহর ---


ফিরে গিয়েছিলাম আরো একবার ২৫ বছর পর, সেই গাঁয়ে। যে তিন কিলোমিটার রাস্তা ৭ কিলোমিটার বানিয়ে তোমাদের আমার পিসির বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই তিন কিলোমিটার রাস্তার দুপাশ এখন কনক্রীটের জঙ্গল। সিএনজি এখন সোজা বাড়ির উঠানে পৌঁছায়। মাঁটির ঘরগুলি এখন ইট-কাঠের দালান। এলাকার দরিদ্র লোক জমি বেঁচা টাকায় স্বাচ্ছন্দ্য এনেছ। দুপুরের খাবার খাওয়ার আগে সেই আমবাগ খুঁজতে বেরোলাম। কোনভাবেই আর কিছুই আগের সাথে মেলেনা। তারপর হঠাৎ সেই কিশোরী (প্রেয়সী) কোমড় বাঁক আজো আছে একি?? সাথে আজো দাড়িয়ে আছে কয়েকটা একাকী বাঁশ বন।


প্রথমে ভেবেছি হারিয়ে গেছে সবই। কিন্তু না মানুষগুলি আছে, সেই প্রেয়সী বাঁক রাস্তা আছে। মানুষের মনটাও আছে। তোমার নিমন্ত্রন রইল আবার সেই বিষন্ন একাকী দাড়িয়ে থাকা স্বজন হারা বাঁশ বাগানের দেশে।

বৃহষ্পতিবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১১

পথ থেকে পথে

ঢাকা থেকে সিলেট 
 তারিখঃ ২৫/০১/২০১১
সব বর্ণনার গৌড়চন্দ্রিকার প্রয়োজন পরে না। যারা আমার সহমর্মী-সহকর্মী ও যারা নন,  তারা ছাড়া সকলের জন্য আমার এই পূর্বকথন। এটি কোন ভ্রমন কাহিনী হয়ে উঠতে পারতো যদি আমি লেখক হতাম (লেখাটি ভ্রমন কাহিনী হয়ে গেলে আমার লেখক হবার সম্ভাবনা আছে)।

“সাধারনত মানুষ বাহন ব্যবহার করে এক যায়গা থেকে অন্য যায়গায় যাবার জন্য। কখনো কখনো বাহন মানুষ ব্যবহার করে একই কাজে।“

            গতকাল সমস্ত অফিসিয়াল কাজ শেষ করে রাখা হয়েছে, সুতরাং আজকে সকাল সকাল রওনা হওয়া যাবে। নাস্তার সময় নেই। তাড়াতাড়ি শিক্ষাভবনে পৌছাতে হবে। ধামরাই থেকে প্রায় আড়াই ঘন্টা লাগবে। আটটার বাস ধরতে পারলে এগারটার মধ্যে সিলেটের পথে রওনা হতে পারবো। ড্রাইভার রেজাউল গত রাত্রে ঢাকা এসেছে শিক্ষাভবন থেকে একটি গাড়ি চালিয়ে সিলেট নিয়ে যাবার জন্য। গাড়িটি অনেক ঝামেলা করে সংগ্রহ করা হয়েছে। এস ই ডি পি প্রকল্পের গাড়ি ডি আই এ এর কাছে ছিল, টিকিউআই-সেপ এর অর্থায়নে সিলেটে জাফর ইকবাল স্যারের একটি প্রকল্পে গাড়িটি ব্যবহারের জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করে। দীর্ঘ ছয় মাস নানা প্রতিকুলতার মোকাবেলা করে টিকিউআই-সেপ এর প্রকল্প পরিচালক শেষ পর্যন্ত গাড়িটির ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। আমার দায়িত্ব মাইক্রোবাসটি সিলেট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। গতকালই গাড়িটি বুঝে নিয়েছি।

মাইক্রোবাস
মডেল এল-৩০০ নং ঢাকা মেট্রো চ-৫১-৪৬১৮
বডিঃ বহু ব্যবহারের চিহ্ন বহন করছে
চাকাঃ টায়ার একেবারে মসৃন
ফুয়েলঃ গ্যাস ও পেট্রল
গ্যাস সিলিন্ডারঃ ৬২.৫ কেজি (গ্যাস কিট সম্ভবত ত্রুটিযুক্ত)
কাগজপত্র ও অন্যান্য
            রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স টোকেন (কর পরিশোধ), ফিটনেস সনদ, চাবি (একটি), জ্যাক

সকাল ৭ টা ৩০
মাঘ মাসের সকাল। বড় কষ্ট হল বিছানা ছাড়তে। এখনি রওনা না হলে সন্ধ্যার আগে সিলেট পৌছানো যাবে না। নাস্তা পথে কোথাও করে নেব।

সকাল ১০ টা ৩০
শিক্ষাভবনের নীচ তলায় মাইক্রোবাসটি রাখা আছে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। ড্রাইভার রেজাউল এখনো পৌছেনি। চাবি আমার কাছেই। একটু গাঁইগুঁই করে শেষ পর্যন্ত গাড়ি স্টার্ট নিল। রেজাউল এসে পরায় গাড়ির পিছনের বসে যাওয়া চাকা বদলাতে বলে ডিপিডি স্যারের সাথে দেখা করে এলাম। গাড়ি আর স্টার্ট হয় না। খুসখুসে কাশির রূগীর মত কাশতে থাকে। সিদ্ধান্ত হল ঠেলে চালু করা হবে।

সকাল ১১ টা ৩০
মেকার এসেছে। লিক হওয়া চাকা বদলাতে গিয়ে রেজাউল নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মেকার যখন ঘোষনা দিল সেলফ এ সমস্যা ঠিক তখনি মাইক্রোবাসটি চালু হল। মেকার চারশ টাকা নিয়ে বিদায় হল। এর পর স্টেডিয়ামের পাশ ঘুরে সায়দাবাদ হয়ে সিলেট। .........।

সকাল ১১ টা ৪৫
অভিসার সিনেমা হল পাশে এটিএম (ব্র্যাক ব্যাংক)। যেই থেমেছি ওমনি বিগড়ে গেল গাড়ি। রেজাউল তিন লিটার পেট্রল (তেল) নিয়ে এল। এরপর প্রায় পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা (এখন থেকে গাড়িটিকে ব্যক্তি হিসাবে দেখতে হবে মনে হচ্ছে) আর আমি হলাম গাধা। আক্ষরিক অর্থেই ঠেলতে হল। একজন ফিফথ গ্রেড অফিসার হয়ে আমাকেই কিনা......।

দুপুর ১২ টা ৩০
এর মধ্যে তিনবার নামতে হয়েছে গাড়ি থেকে। কেনো? রাধাকে সাধা। তবে আমরা এখনো সায়দাবাদ এর মোড় পার হইনি, তবে ইঞ্জিন এখন চালুই আছে। জ্যামের মধ্যে বন্ধ হলে মান ইজ্জত বিসর্জন হয়ে যাবে বিনা দশমীতে। যাক রেল ক্রসিং পার হয়েছি।
দুপুর ১২ টা ৩০
জনপথ মোড়ের আগে বিগড়ে গেলেন রাধা। চারজন উটকো লোক একশ টাকার বিনিময়ে অবাধ্য রাধাকে ঠেলে বাহন স্রোতে তুলে দিল। বোধ করি ঢাকার দূষিত বাতাসেই যক্ষা আক্রান্ত হলেন বিনোদিনী। দুটি কাশি, একটি হাসি আর আমার ফাঁসি একসঙ্গে ঘটলো। ঠিক একটি চৌরাস্তায়। ঘটনার কেন্দ্রে থাকার খায়েস ছিল তাই বলে এভাবে জ্যামের কারণ হিসাবে নয়। এবার এই ফিফথ গ্রেড অফিসারের সাথে কাধ মেলালেন ট্রাফিক পুলিশ (এদের সম্পর্কে অনেকেই (আমি সহ) নিন্দাবাক্য বলে)।

দুপুর ০১ টা ৩০
আমাদের বর্তমান অবস্থান চৌরাস্তার কেন্দ্র হতে বিশ গজ সামনে রাস্তার ডান দিক ঘেঁষে। একজন প্রবীন মানুষ আমার দিকে আধা-করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন। ইনি যাত্রাবাড়ি ফ্লাই ওভার নির্মান কোম্পানীর কর্মচারী। পাঁশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন জাতের গাড়ির স্রোত ধীরে ধীরে। প্রায় একঘন্টা ধরে বসে আছি। ছুঁচোর কেত্তন চলছে পেটে যদিও আধ সের পরিমান ধুলা গেলা হয়ে গেছে। রেজাউল গেছে লেবার অথবা মেকার খুজতে। শেষ ধাক্কা দেয়ার সময় শরীর জানান দিয়েছে বয়স হয়েছে। মনে সাহস আনছি এই ভেবে চল্লিশ এমন কোন বয়স নয়। এই বয়সে সত্যজিত রায় ফেলুদা লিখতে শুরু করে সফল হয়েছেন।

বিকাল (প্রায়) ০3 টা ৩০
মেকার এসেছে। লেবারও এসেছে। পাঁচজন লোক মিলে কোন রকমে বামের রাস্তায় নিয়ে আসা হয়েছে। রাস্তাটি একদিকে ঢালু। লেবার তিন জন একশ বিশ টাকা হজম করে আমাকে আর্থিক ভাবে হাল্কা হতে সাহায্য করল। এবার মেকার ড্রাইভ করতে শুরু করলে আমার মনে রেজাউলের দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ ও হতাশা জেগে উঠল। এখন বেশ চলছে গাড়ি। সবিনয় অনুরোধে মেকার ভদ্রলোক গলি পথে আমাদের ডেমরা রোড পর্যন্ত ড্রাইভ করে পৌছে দিল। জানিয়ে দিল সেলফ কাজ করছে না (ঠিক করতে কমপক্ষে তিন ঘন্টা)। সুতরাং ইঞ্জিন বন্ধ হলে ধাক্কা ছাড়া স্টার্ট হবে না। এবং গ্যাস ছাড়া ধাক্কা দিয়েও ইঞ্জিন চালু হবে না এমনভাবেই গ্যাসের লাইন করা আছে। একশ টাকা বকশিশ কম হয়ে গেল কি না কে জানে, বিশেষ করে সে যখন তার প্লায়ার্স গাড়িতে ফেলে গেল।

বিকাল (নিশ্চিত) ০৫ টা ১৫
ঢাকা শহর ফেলে সিলেটের পথে বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে হিসাব করতে শুরু করা গেল। গ্যাস নিতে হবে প্রথম সুযোগেই। গ্যাস মিটারে তিন বাতি জ্বলছে। কোন গ্যাস স্টেশন গ্যাস দিলনা। পাঁচটার পর বন্ধ। আবার রাত নয়টার পর খুলবে। সারে চার ঘন্টার অপেক্ষা। সিদ্ধান্ত হল মাধবদী গিয়ে সেলফ ঠিক করে নিয়ে তারপর গ্যাস নিয়ে যাত্রা শুরু করব। বহু পরিশ্রমে সেলফটি গাড়ির তলা থেকে খুলে আনা হলে দেখা গেল সেটি পুড়ে গেছে। ঠিক করতে দুই হাজার টাকা এবং তিন ঘন্টা সময় লাগবে। প্রস্তাব নাকচ করা হল। ধাক্কা পদ্ধতি ব্যবহার করেই সিলেট যাব। ব্যাটারী শর্ট হয়ে যেতে পারে সন্দেহে সেটি খুলেই রাখা হল। পেটের ছুঁচো গুলি ক্লান্ত হয়ে কেত্তনে ক্ষ্যান্ত দিয়েছে।

রাত ৮ টা ৪৫
ইসলাম সি এন জি ফিলিং ষ্টেশন, মাধবদী এর পাশে একটি দোকানে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্যান্ডউইচ খাচ্ছি। শরীরের সমস্ত পেশী বিদ্রোহ করেছে। ধাক্কা পদ্ধতি কতটা নির্মম হতে পারে তার একটি নমুনা অভিজ্ঞতা হয়েছে গত এক ঘন্টায়। সাত দফা ধাক্কা স্টার্ট (আমি একা) বিফল হলে অনেক খুজে তিনজন লোক ভাড়া করা হল। আরো দেড়শ গেল। আরো পনের মিনিট পর গ্যাস দেবে।

রাত ১১ টা ০০
মাধব পুর ছাড়িয়ে শায়েস্তাগঞ্জ এর পথে হাইওয়ে ইন; ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রচেস্টা। পথে পচাত্ত্র কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে গ্যাস নেয়া হয়েছে তারপর ত্রিশ কিলোমিটার চলে আরো একবার। আরো একশ ছাব্বিশ কিলোমিটার পথ। ছোট্ট একটি দুঃসংবাদ হল সিলেটের আগে আর কোন গ্যাস স্টেশন নাই। হিসাব বলে সিলেট এর দশ কিলোমিটার এর মধ্যে পৌছে যাব। দেখা যাক।

রাত ২ টা ১০
সিলেট পৌছে গেছি। শেষ বিশ কিলোমিটার রূদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। টপ গিয়ারে গাড়ি সত্তুর কিলোমিটারের বেশী বেগ তোলা যাচ্ছে না কারন কুয়াশা ছাড়াও গাড়িভ চাকা যাকিনা একেবারেই মসৃন। রেজাউল প্রতিটি মাইল স্টোন গুনে আর কত পথ বাকি তার হিসাব দিচ্ছে ধারাবিবরণী স্টাইলে। এ যেন শেষ ওভারে শেষ ব্যাটস ম্যানের পাচ বলে দশ রান তোলার টার্গেট। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে তুলে নেয়া একজন গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী এই ঘটনার অংশীদার। উনি প্রয়োজনে গাড়ি ধাক্কা দিতে হবে এই শর্তে আমাদের সঙ্গী হয়েছিলেন।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত)

শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১০

আইলাম ভিলেজ (Ilam Villege)

বিমানবন্দরের দরজা দিয়ে বেড়োতেই ক্রাইস্টচার্চের ঠান্ডা বাতাস কামড়ে ধরলো মুখসহ শরীরের খোলা অংশে। আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে Anthony (Tony) Baird, Project Coordinator, International Programmes, University of Canterbury এবং কয়েকজন মাস্টার্স পড়ূয়া ছাত্র উপস্থিত। এদের কয়েকজনের সাথে আমরা আগে থেকেই পরিচিত। মূহুর্তটি ছিল অসাধারণ। বিদেশের মাটিতে পরিচিত মুখ খুজে পাওয়া (বিশেষ করে গত দুদিন ধরে বিমান ও সিঙ্গাপুরের মাটিতে যে ধরনের বৈদেশিক আবহাওয়া সহ্য করে এসেছি তার পর..) "যেন ধরে প্রান আসলো ফিরে"। বিশাল আকৃতির বাসটিতে আমার সবাই বমাল আরোহন করার পর ঠান্ডার খোঁচা খানিকটা কমলো। মাহবুব, হারুন, সালাউদ্দিন (মাস্টার্স পর্বে অধ্যয়নরত ছাত্র) আমাদের চলার পথেই ছোট ছোট কিন্তু অত্যন্ত জরুরী তথ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যদিও আমাদের তখন প্রাথমিক কাম্য বস্তু ছিল একটা উষ্ণ ঘর ও ঘুমাবার একটু অবসর। ঘন্টা খানেকের মধ্যে ঘর জুটলেও অবসর জুটলোনা। আমাদের আবাস স্থলের নাম আইলাম অ্যাপার্টমেন্টস।  বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই গড়ে উঠা চমৎকার একটি আবাসন ব্যবস্থা। মালিকানায় বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু পরিচালিত হয় আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে। 


হোমস্টিড লেনে একবারে মুল রাস্তা ঘেসে আমাদের অস্থায়ী নিবাস (৮ সপ্তাহের জন্য)। রাস্তাটি দিয়ে অরবিটার নামক টাউন সার্ভিস যায়। আবাস স্থলের সাথেই একটি কমন রূম (এখানে যে সকল সুবিধা ফেলে রাখা আছে সেগুলি কল্পনা করলেও দুর্বল চিত্ত কারো হৃত কম্পনের হার বেড়ে যেতে পারে তাই নামগুলি উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম)। 

বাস থেকে নেমেই আমাদের প্রথম কাজ ছিল কমনরুমে জমায়েত হওয়া ও যার যার রুমের চাবি বুঝে নেয়া। এসময় আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে বিশ্ববিদ্যালয় কোর্স  কোর্ডিনেশনের পক্ষ হতে ডেরেক, ডিগবী, নীলস উপস্থিত ছিলেন। আমাদের প্রথম কাজ ছিল ব্যাগপত্র ঘরে রেখে একটু সুচী হয়ে কমনরূমে জমায়েত হওয়া। নিউজিল্যান্ডের প্রথম আপ্যায়নের মুখোমুখি হলাম এসময়। ভেতো বাঙ্গালী বড় কষ্ট পেয়েছে সমগ্র যাত্রাপথে। সকালের নাস্তাটি স্যান্ডউইচ, ফ্রুট জুস, কফি বা চা ইত্যকার সহযোগে সারা গেল (অবশ্যই  সমন্বয় কমিটির আপ্যায়নে)। এরপর ব্যাংক একাউন্ট খোলার কাজ। আমাদের দৈনিক ভাতার পুরো টাকাটাই আমাদের একাউন্টে দেয়া হবে। মোট ৪২ জন মোটামুটি চারটি ভাগে বিভক্ত হয়ে ব্যাংকের উদ্দেশ্যে চললাম। অত্যন্ত সুসজ্জিত ও সুশৃংখল BNZ ব্যাংকটির আইলাম শাখাটি এবং সেই সাথে অত্যন্ত ছোটও। এরা প্রতিটি বর্গ ইঞ্চি যায়গার ব্যবহার এমন ভাবে করেছে যে, বিষয়টিকে কৃপনতার উদাহরণ হিসাবে নেয়া যায়। একটি একাউন্ট খুলতে সময় লাগলো সারে চার মিনিটের মত। একটি ডেবিট কার্ড (EFTPOS)দেয়া হল। আমরা আমাদের পছন্দমত পাসওয়ার্ড বসিয়ে কার্ডটি আমাদের নিজের করে নিলাম।এ কার্ডটি ব্যবহার করে  টাউনবাস টিকেট ছাড়া যেকোন ধরনের কেনাকাটা করা যায়। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়/সমন্বয়ক (টিটিটি) আমাদের একাউন্টে টাকা দেয়নি। কিন্তু ব্যাংক বলল যে আমরা চাইলে টাকা তুলতে পারি। এটিএম মেশিনে গিয়ে টাকা চাইলাম, দিলনা। ব্যাংকের কাউন্টারে জানাতেই বলল এটিএম কাজ করবে একাউন্টে টাকা আসার পর। তবে আমরা চাইলে কাউন্টার থেকে টাকা তুলতে পারি। যাচাই করার জন্য আমি বিশ টাকা (ডলার) তুললাম। রাস্তার যে পাশে ব্যাংক তার উল্টোদিকেই একটি বিরাট বাক্সমত বিল্ডিং। বাস্তবে এটি একটি শপিং মল। এতে আছে কাউন্টডাউন (বিস্তারিত বিবরন পরবর্তী সময়ে)। হেটেই ফিরলাম। ভাবছিলাম দেড় ঘন্টায় ৪২ টি ব্যাংক একাউন্ট খুলে ব্যাংকের ম্যানেজার (সদা হাস্যময় মোটামত এক মহিলা) এত খুশি কেন হল। আমাদের কাছ থেকে তাদের সবোর্চ্চ আয় দুইমাসে ৪০০ ডলারের মত। ফিরলাম আইলাম এপার্টমেন্টে। অবশেষে অবসর। লম্বা ঘুম।