সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৪

চিঠির পর

সুচরিতাসু

             ভেবেছিলাম চিঠি লেখা হয়ে গেলে হালকা হয়ে উঠবে বুকটা। হয়েছিলও তাই। তবে দিন যতই রাতের দিকে গড়াতে থাকল ততই নিজের মনে সন্দেহ বাড়তে থাকল " সত্যিই কি আমি কোন উত্তরের প্রত্যাশা করছিনা "। অনেক অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। শেষ পর্যন্ত নিজের সাথে একটি রফায় এলাম। রাত্রির রহস্যময়তার কাছে নিজেকে সমর্পন করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

রাত্রি,
        রাতের সাথে মিত্রতা আমার অনেক দিনের। অনেক বেশি নিজেকে চেনার সুযোগ ঘটে এসময়টায়। নজর দিতে পারি নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য এক রহস্যময় মানুষের সাথে যোগাযোগের দিকে। ভোর রাতের দিকে সেই রহস্যময়তা আমাকে জানিয়ে গেল আমি এখনও প্রস্তুত নই সত্য জানার জন্য।

আমি রাত্রিকে ভালবাসি আবার ভয়ও পাই একই সাথে। রাতের ঘুম আমার ভয়ের উৎস হয়ে আছে অনেক বছর ধরে। আসলে ঘুমের অনুষসঙ্গী স্বপ্নে আমার ভয়। না চাইতেও সত্যে পরিণত হওয়া স্বপ্নগুলি আমি আর দেখতে চাই না। কিন্তু দেখতে হয়। অনেক বছর আগে তোমাকে নিয়ে দেখা একটি ভয়ংকর স্বপ্ন আজ আমার বাস্তব সময়। সেই স্বপ্নের কথা তোমাকে বলেছিলাম। তুমি বলেছিলে এ তো ভয়ংকর ব্যাপার। আজ সেই ভয়ংকর বিষয়টাই বাস্তব।

আমি উত্তরের প্রত্যাশা করি নি কিন্তু অপেক্ষা করে আছি। কেন জানিনা। তোমার খবর জানার কোন উপায় নেই। কিন্তু ইদানিং বড় বেশী জানতে ইচ্ছে করে। কেন জানিনা। আমার ফোনের জবাব দেবেনা, এস এম এস এর উত্তর দেবেনা জানি। কিন্তু শুধু এটাই জানিনা কেন

যা, যেভাবে চেয়েছিলে তার প্রায় সবটাই তো পেয়েছো। 

আমার এক বন্ধু আমাকে বলল আমার বোকামী হয়েছে। সব সময় সব দায় নিতে নেই। হয়তো তার কথা সত্যি। হয়তো না। আমি শুধু একটা বিষয়ই জানি সব সময় বুদ্ধিমান হওয়া যায় না। প্রয়োজন নেই। 

আমার পাশে অনেকেই আছে। তারপরও একা কেন লাগে জানিনা। যাদের কাছে তোমার খবর জানতে চাইতে পারি তারা সাড়া দেয় না। আগেও হয়েছে এমনটা। কি করি। নিজেই যাব তোমার কাছে

যাব একদিন। দাড়াবো সামনে গিয়ে। কোন অধিকার নিয়ে নয়। শুধু দেখতে কেমন আছ। 

এর মধ্যেই যদি অন্য কারো হয়ে গিয়ে থাক তবে ভীষণ বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হবে। শুধু যদি কেউ আমাকে জানাতো, তোমার জীবনে আমার আর কোন প্রয়োজন নেই তবে সবাইকে বিব্রত করার কাজটা বন্ধ করে দিতে পারতাম। 

কেন জানিনা ফুপুর কাছে শোনা তুমি বলেছিলে " আমি তোমার ছিলাম তোমার থাকবো " কথাটি বিশ্বাস করতে বড় সাধ হয়। সাহস হয় না। 

আমি ভালবাসি এ আমার জানা। আমি এখনও প্রেমে পরে আছি এটা আবিস্কার করে নিজেকে কেমন জানি মানুষ মানুষ মনে হচ্ছে। আমার ভিতরেও একটা মানুষ বাস করে, যে কিনা অনেকের মতই রক্ত মাংশের ব্যাপারটা সবার জন্যই হয়ত একটু অবাক করা। আমার নিজের জন্যও।

ভাল থেকো।


রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৪

শেষের গল্প

২০১৪ সাল এর সবগুলি সংখ্যা যোগ করলে ফলাফল দাড়ায় ৭। লাকি নাম্বার তাই না? আমার জন্য নয়। ৮ ই সেপ্টেম্বর। তারিখ ৭+১, মাস ৭+২ আমার সৌভাগ্যের প্রতীক নয়। ১৭ আমার শেষের শুরু। আর তাই আমাকে লিখতে হবে। শুরু করছি আমার শেষের গল্প।

চিঠি পর্বঃ


সুচরিতাসু

অনেক দিন লিখি না তোমায়। অনেকবার কাগজ কলম নিয়ে বসেছি। হাতের লেখা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে অনেক, ডাকঘর অনেক দূর এরকম অনেক অনেক কারণ দেখিয়ে না লেখার অজুহাত দিতে পারি। সত্যি কথাটি হল তুমি আমার লেখা পড়বে না এই আশংকায় লিখি নি। 

রূঢ় আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবার তাগিদ আমাকে আজ লিখতে বসিয়েছে। আমার সারা জীবনে তোমার সাথে যত রূঢ়, কঠিন বা তোমার অপছন্দের ব্যবহার করেছি তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী।

আমার প্রতি তোমার ঘৃনাবোধ যদি না কমে থাকে তবে পরের কথাগুলি না পড়লেও ক্ষতি নেই। জীবনে প্রথম স্বার্থপরের মত নিজের কথা বলছি। যদিও এর জন্য কোন গ্লানি বোধ করছি না। 


কথা হয়নি বিদায়ের আগে। অনেক ক্ষুদ্রতা দিয়ে গড়া দেয়াল ছিল, ছিলে তুমি অনেক দূরে। আমার কথা তুমি পর্যন্ত পৌছে নি। আমারই দায়। আমি পারিনি তোমার কাছে যেতে। মনে হয়েছে আমার সাথে সুখি নও, হয়ত অন্য কারো কাছে তোমার সুখ জমা হয়ে আছে। ভাবনাটা কষ্টের, বড় বেশী কষ্টের। পাগল করে দেয় মাঝে মাঝে। কিন্তু আমি তোমাকে অ সুখে রেখেছি এ চিন্তা আমাকে প্রতি দিন, প্রতি মূহুর্তে মেরে ফেলতে চাইত। আমি ঈশ্বর নই। সাধারন মানুষের সহ্য ক্ষমতার বাইরে আমার যাবার সাধ্য নেই।

তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করে খুব। সব সময়ই করত। এখন পাশে না থেকেও অনেক বেশী আছো। সারাক্ষণ সব সময়। আমাদের ছবির সাথে কথা বলে সময় কাটে। কাজে যাওয়া পরিশ্রম করা তারপর বাড়ি ফেরা (তোমার কাছে) বদলে গেছে এখন। আমি যাই অনেক যায়গায় কিন্তু ফিরিনা কোথাও।

তেইশ বছর আগে যেদিন তোমায় প্রথম দেখি, সেদিন থেকেই জানি ভালবাসি তোমায়। তোমায় বলা হয়নি কারন ভয় ছিল বললেই যদি হারিয়ে ফেলি। এ আমার অহংকার নয় ভীতি। আমায় ছেড়ে যেওনা বলেছি অনেকবার। আমার ভালবাসাকে ঐ বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে দিয়েছি তোমায়।

আমি এখন নিশ্চিত ভাবেই জানি আমি শুধু তোমাকেই ভালবাসি। আমার বিশ্বাস তুমিও সেটি জান। কোন আচরণ, চুক্তি বা অনুষ্ঠান এটি বদলাতে পারবে না। বদলায় নি। আমার প্রতি তোমার ঘৃণা প্রমান করে তোমার ভালবাসা। এটি আমার বিশ্বাস। মিথ্যে হলেও আমি এটাই বিশ্বাস করতে চাই। 

দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে বসতে পাশে। না বলে অনেক কথা জানতে আর জানাতে। ইচ্ছে হল রঙ্গীন ঘূড়ি, বাতাস পেলেই ঊড়ে চলে। তেইশ বছর আগে শুরু হওয়া গল্পটি পেরিয়ে এসেছে অনেক মোড়। এক ধাক্কায় শেষ হয় না এ গল্প। এ আজ আমি নিশ্চিতভাবেই জানি।

যা বলেছি আমার একান্ত নিজের কথা। তোমার উপর দাবি নেই কোন। তোমাকে দিতে পারিনি যা ছিল দেয়ার তোমার মত করে। সাধ্যের মধ্যে ছিল স্বাধীনতা, তাই দেয়ার চেষ্টা করেছি।

আমি কোন উত্তরের আশা করিনা। যতদিন সে প্রত্যাশাটি ছিল লিখতে বসি নি। আজ লিখলাম। 

ভাল থেকো। 

শুক্রবার, ৬ এপ্রিল, ২০১২

তুখোড় শিক্ষক

সাকিব
কেমন আছ। দেখলাম তুমি আমার আগের পোষ্ট পড় নি। আমার ব্লগটি এবার শুধু গরিব নয় একেবারে ভিখিরি হয়ে গেল। যা হোক এবার আমি লিখছি কিছু ধারণার বিষয় নিয়ে। জানোইতো নতুন নতুন ভাবনা আমার মাথায় কিলবিল করতে থাকে যতক্ষন না সেগুলির বাস্তব প্রয়োগ সংক্রান্ত বাস্তবতা সজোরে চড় মেরে আমাকে মাটিতে নামিয়ে আনে। যে ধারণাটি আমাকে জ্বালিয়ে যাচ্ছে তা হল শিক্ষকদের কিছুটা জনপ্রিয়তার স্বাদ দিকে পারলে কি হয় তা দেখা।

জ্বি হ্যাঁ আমি শিক্ষকদের স্টার বানাতে চাই। তাদের নিয়ে আসতে চাই পাবলিক খেতাবের তালিকায়। এই পোড়া দেশে সবাই কিছু না কিছু পায় মিডিয়ার কল্যানে, শুধু স্কুলের মাস্টাররা বাদে। গানে সুপারস্টার, নাচে, অভিনয়ে সব খানেই প্রচারের একটা প্রভাব পড়েছে আজকাল। মায়েরা বাবারা বাচ্চাদের ছবি আঁকার ক্লাসে পর্যন্ত প্রতি সুক্কুরবার নিজের ব্যক্তিগত আয়েষ সারেন্ডার করে নিয়ে যাচ্ছেন। মিডিয়া আজকাল অনেক অসাধ্য সাধন করছে। শিক্ষকতা পেশাকে পপুলার করার কাজটি তারা যদি করে তাতে কোন দোষের কাজ হবে কিনা আমার জানা নেই। তবে শিক্ষকেরা যদি তাদের জন্য বরাদ্দ কাজটি করার জন্য বাড়তি কোন প্রচার পায়, অর্থ পায় তাতে ভাল হবে বলেই আমার মনে হয়।

আমার বিশ্বাস শিক্ষকতা এমন একটি শিল্প যা চর্চা করা হয় অত্যন্ত অগোছালো আর অপরিকল্পত ভাবে- অন্তত আমার এই হতভাগা দেশে। অথচ সঠিক পথে চর্চা করা হলে এটিও হয়ে উঠতে পারে একটি সুষম সংগীত। দেশের বাইরের ধণী আর উন্নত দেশগুলির কথা আমি জানি না। হয়তো সেখানে অবস্থা ভিন্ন।

আমি কজটি করতে চাই। অন্তত চেষ্টা করতে চাই যতক্ষন পর্যন্ত না বাস্তবতার চড়টি গালে এসে পড়ে। আমার জন্য আমিই নিজেকে বলছি- Best of luck.

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০১২

বেগুণী শাড়ী

সাকিব
এ লেখাটি তোমার জন্য। এই দরিদ্র ব্লগের এখন পর্যন্ত তুমিই একমাত্র পাঠক। ভবিষ্যতে পাঠক সংখ্যা বাড়বে এমন প্রত্যাশা না করেই আজকের লেখাটি লিখতে বসলাম।


২৫ বছর আগের কোন একটি দিনে নটরডেম কলেজের তিন ছাত্র (দুই জনের স্বাস্থ্যের যোগ ফল তৃতীয় জনের সমান) হঠাৎ করেই বেড়িয়ে পরে গ্রাম দেখতে। মানস, রুমী (সাকিব আহসান) আর লিপন (মাহবুবুর রহমান) ত্রিমূর্তী ঢাকার কাছেই আশুলিয়া এলাকার জিরাবো হয়ে ইয়ারপুর গ্রাম দেখার প্রত্যাশায় বাসে চড়ে বসে। এলাকাটি উঁচু বলে স্থানীয় লোকের কাছে এর নাম ট্যাংগোর। 

দলটির নেতা মানস (?! ওর পিসির বাড়ি ওই এলাকায়)। বাস থেকে নেমে বাঁশবন ছাঁওয়া ঘন আম-কাঠালের বাগানের মধ্য দিয়ে পায়ে হেটে ৩ কিলোমিটার মত। সময়টা বর্ষার কাছাকাছি কোথাও। আকাশ তখন পরিস্কার বলে দিনটি ঝকঝক করছিল। শহুরে লোকের হিসাব মতে সকালের নাস্তা খাবার সময়টায় ত্রিমূর্তী নানা জাতের পাখ-পাখালী সৃষ্ট কলতানের নদী সাঁতরে চলছিলো অজানা গন্তব্যর দিকে। পিসির বাড়ির রাস্তা কিছুটা জানা আর বেশীর ভাগই আন্দাজের উপর, এই মানসিক অবস্থায় নেতাটি বার তিনেক পথ হারিয়ে একঘন্টার রাস্তা প্রায় আড়াই ঘন্টায় পাড়ি দিলো (যদিও সে সর্বদাই দাবি করে আসছিলো যে সে সঠিক রাস্তাটিই ব্যবহার করছে)। সংগীদের মধ্য দ্বিগুন স্বাস্থ্যের সদস্য খানিকটা গাঁই-গুঁই করে পথ চলছিল। সংগীটিকে চিনতে পারছো নিশ্চয়ই।


বেগুনী শাড়ী পড়া পিসির বাড়ি পৌঁছে আদি গ্রাম্য আতিথেয়তার কথা তোমার মনে আছে? কাঠাল-মুড়ির নাস্তা তারপর ভয়ংকর ঝাল দিয়ে রান্না করা মুরগী মনে পড়ে? ভাত খেতে বসে চোখের জল নাকের জলে একাকার। আমি তো পরবর্তী এক সপ্তাহ সোজা হয়ে বসতে পারি নি। মনে পড়ে?


বাড়ি থেকে বের হয়ে হাতের ডানে নতুন কিশোরীর মসৃন কোমড়ের বাঁকের মত  রাস্তা ধরে আম-কাঁঠালের বাগ, তাল গাছ আর বৃষ্টি ভেঁজা রাস্তায় টলোমলো পায়ে চলতে চলতে প্রান খোলা হাসির লহর ---


ফিরে গিয়েছিলাম আরো একবার ২৫ বছর পর, সেই গাঁয়ে। যে তিন কিলোমিটার রাস্তা ৭ কিলোমিটার বানিয়ে তোমাদের আমার পিসির বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই তিন কিলোমিটার রাস্তার দুপাশ এখন কনক্রীটের জঙ্গল। সিএনজি এখন সোজা বাড়ির উঠানে পৌঁছায়। মাঁটির ঘরগুলি এখন ইট-কাঠের দালান। এলাকার দরিদ্র লোক জমি বেঁচা টাকায় স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে। দুপুরের খাবার খাওয়ার আগে সেই আমবাগ খুঁজতে বেরোলাম। কোনভাবেই আর কিছুই আগের সাথে মেলেনা। তারপর হঠাৎ সেই কিশোরী (প্রেয়সী) কোমড় বাঁক আজো আছে একি?? সাথে আজো দাড়িয়ে আছে কয়েকটা একাকী বাঁশ বন।


প্রথমে ভেবেছি হারিয়ে গেছে সবই। কিন্তু না মানুষগুলি আছে, সেই প্রেয়সী বাঁক রাস্তা আছে। মানুষের মনটাও আছে। তোমার নিমন্ত্রন রইল আবার সেই বিষন্ন একাকী দাড়িয়ে থাকা স্বজন হারা বাঁশ বাগানের দেশে।